ফরিদগঞ্জ ১০:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
১২ বছর পালিয়েও চাকরি বহাল! ফরিদগঞ্জে মাদ্রাসা সুপারের নজিরবিহীন জালিয়াতি ফাঁকা ঘরই ছিল টার্গেট।। দক্ষিণ শাশিয়ালীতে প্রবাসীর কষ্টার্জিত সম্পদ চুরি ফরিদগঞ্জে জমি নিয়ে বিরোধে বসতঘরে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ, আহত ৪ ফরিদগঞ্জে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে কিশোর নিহত, আহত ৪ ফরিদগঞ্জে মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে ২৫ বছরের দ্বৈত চাকরির অভিযোগ স্কুল ফেলে ভূমি অফিসে প্রাথমিকের শিক্ষকরা! প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ উপলক্ষে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন প্রাথমিক বৃত্তি পেলো রাফি আহমেদ একই আকাশে দুই তারার দীপ্তি, ট্যালেন্টপুলে জমজ দুই বোন অসুস্থ সাংবাদিকদের রোগমুক্তি কামনায় ফরিদগঞ্জ প্রেসক্লাবে দোয়া মাহফিল

১২ বছর পালিয়েও চাকরি বহাল! ফরিদগঞ্জে মাদ্রাসা সুপারের নজিরবিহীন জালিয়াতি

নিজস্ব প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৪:৪৩:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

টানা ১২ বছর মাদ্রাসায় অনুপস্থিত এক শিক্ষক। তিনি কোথায় আছেন, কীভাবে আছেন-তার কোনো দাপ্তরিক হিসাব ছিল না প্রতিষ্ঠানে। তবুও বহাল তবিয়তে সচল ছিল তাঁর সরকারি এমপিও ইনডেক্স! অবশেষে ১২ বছর পর হুট করেই কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে আবার স্বপদে ফিরে এসেছেন তিনি। চাঞ্চল্যকর ও অভিনব এই জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটেছে চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার পূর্ব এখলাছপুর দারুল এখলাছ আমেনা (রাঃ) মহিলা দাখিল মাদ্রাসায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক আল মামুন এমএলএ (ডেসটিনির মতো মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং) কোম্পানির নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে ২০১২ সালে আত্মগোপনে যান। ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ বছর তিনি এলাকা ছেড়ে পলাতক ছিলেন। তবে এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির খবর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা শিক্ষা বোর্ড-কাউকেই জানাননি প্রতিষ্ঠানের সুপার মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদ। উল্টো জালিয়াতি ও তথ্য গোপনের মাধ্যমে শিক্ষক আল মামুনের ইনডেক্স (C 2000896) সচল রাখেন তিনি।
অভিযোগ উঠেছে, এই যোগসাজশের মাধ্যমেই ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে একটি সাধারণ সাদা কাগজে আবেদন জমা দিয়ে আবার স্বপদে যোগ দেন প্রতারণা মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক আল মামুন। যা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২৬-এর ১৮ ধারার ১ (গ) উপধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। উক্ত নীতিমালায় বলা আছে-মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে বা অধিদপ্তর ও বোর্ডের নির্দেশ প্রতিপালন না করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানের এমপিও বাতিল এবং ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে মামলা দায়েরের বিধান রয়েছে।
টানা ১২ বছর অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষক আল মামুন দাবি করেন, “রাজনৈতিক কারণে আমি এলাকায় থাকতে পারিনি।” তবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক মামলা হয়েছিল কি না-জানতে চাইলে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনৈতিক মামলার কথাটি পুরোপুরি কাল্পনিক। মূলতঃ তিনি প্রতারণা করে মানুষের কোটি টাকা আত্মসাৎ করে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিলেন। পাওনাদাররা এখনো তাঁর সন্ধানে ঘুরছেন।
কোনো নিয়মে বা রেজুলেশনের ভিত্তিতে ১২ বছর পর তাঁকে পুনরায় নেওয়া হলো-জানতে চাইলে মাদ্রাসা সুপার ইকরাম হোসেন হামিদ কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, “২০২৪ সালের আগস্টে আল মামুন এসে সাদা কাগজে একটি আবেদন দেন। আমি তাতে সম্মতি দিয়ে চাকরিতে ফেরাই এবং তাঁর বেতনের বিলে স্বাক্ষর করি।”
এত বছর অনুপস্থিতির পরও কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছিল কি না বা অধিদপ্তরে কেন জানানো হয়নি-এমন প্রশ্নে সুপার তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। তিনি কখনো বলেন, “মনে নেই, দেখতে হবে”, আবার কখনো বলেন, “মৌখিকভাবে জানিয়েছি।” জালিয়াতি ও তথ্য গোপনের বিষয়টি প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ জনতা ব্যাংক (পিএলসি) শাখার ম্যানেজার কে. এম. ফখরুল ইসলাম বলেন, “ইনডেক্স সচল রেখে প্রতিষ্ঠান প্রধান বিল পাঠালে ব্যাংক তা ছাড় করতে বাধ্য। তবে এমন ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আরেকটু সতর্ক হওয়া দরকার ছিল।”
ফরিদগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোস্তফা কামাল ও চাঁদপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ রুহুল্লা জানান, খবরটি জানার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, “দীর্ঘ ১২ বছর প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকেও কীভাবে তিনি বহাল রইলেন তা শুনে খুবই হতাশ হয়েছি। বিষয়টি নিয়ে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের সাথে কথা হয়েছে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জালিয়াতি ও অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

১২ বছর পালিয়েও চাকরি বহাল! ফরিদগঞ্জে মাদ্রাসা সুপারের নজিরবিহীন জালিয়াতি

আপডেট সময় : ০৪:৪৩:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

টানা ১২ বছর মাদ্রাসায় অনুপস্থিত এক শিক্ষক। তিনি কোথায় আছেন, কীভাবে আছেন-তার কোনো দাপ্তরিক হিসাব ছিল না প্রতিষ্ঠানে। তবুও বহাল তবিয়তে সচল ছিল তাঁর সরকারি এমপিও ইনডেক্স! অবশেষে ১২ বছর পর হুট করেই কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে আবার স্বপদে ফিরে এসেছেন তিনি। চাঞ্চল্যকর ও অভিনব এই জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটেছে চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার পূর্ব এখলাছপুর দারুল এখলাছ আমেনা (রাঃ) মহিলা দাখিল মাদ্রাসায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক আল মামুন এমএলএ (ডেসটিনির মতো মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং) কোম্পানির নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে ২০১২ সালে আত্মগোপনে যান। ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ বছর তিনি এলাকা ছেড়ে পলাতক ছিলেন। তবে এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির খবর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা শিক্ষা বোর্ড-কাউকেই জানাননি প্রতিষ্ঠানের সুপার মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদ। উল্টো জালিয়াতি ও তথ্য গোপনের মাধ্যমে শিক্ষক আল মামুনের ইনডেক্স (C 2000896) সচল রাখেন তিনি।
অভিযোগ উঠেছে, এই যোগসাজশের মাধ্যমেই ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে একটি সাধারণ সাদা কাগজে আবেদন জমা দিয়ে আবার স্বপদে যোগ দেন প্রতারণা মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক আল মামুন। যা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২৬-এর ১৮ ধারার ১ (গ) উপধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। উক্ত নীতিমালায় বলা আছে-মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে বা অধিদপ্তর ও বোর্ডের নির্দেশ প্রতিপালন না করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানের এমপিও বাতিল এবং ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে মামলা দায়েরের বিধান রয়েছে।
টানা ১২ বছর অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষক আল মামুন দাবি করেন, “রাজনৈতিক কারণে আমি এলাকায় থাকতে পারিনি।” তবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক মামলা হয়েছিল কি না-জানতে চাইলে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনৈতিক মামলার কথাটি পুরোপুরি কাল্পনিক। মূলতঃ তিনি প্রতারণা করে মানুষের কোটি টাকা আত্মসাৎ করে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিলেন। পাওনাদাররা এখনো তাঁর সন্ধানে ঘুরছেন।
কোনো নিয়মে বা রেজুলেশনের ভিত্তিতে ১২ বছর পর তাঁকে পুনরায় নেওয়া হলো-জানতে চাইলে মাদ্রাসা সুপার ইকরাম হোসেন হামিদ কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, “২০২৪ সালের আগস্টে আল মামুন এসে সাদা কাগজে একটি আবেদন দেন। আমি তাতে সম্মতি দিয়ে চাকরিতে ফেরাই এবং তাঁর বেতনের বিলে স্বাক্ষর করি।”
এত বছর অনুপস্থিতির পরও কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছিল কি না বা অধিদপ্তরে কেন জানানো হয়নি-এমন প্রশ্নে সুপার তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। তিনি কখনো বলেন, “মনে নেই, দেখতে হবে”, আবার কখনো বলেন, “মৌখিকভাবে জানিয়েছি।” জালিয়াতি ও তথ্য গোপনের বিষয়টি প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ জনতা ব্যাংক (পিএলসি) শাখার ম্যানেজার কে. এম. ফখরুল ইসলাম বলেন, “ইনডেক্স সচল রেখে প্রতিষ্ঠান প্রধান বিল পাঠালে ব্যাংক তা ছাড় করতে বাধ্য। তবে এমন ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আরেকটু সতর্ক হওয়া দরকার ছিল।”
ফরিদগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোস্তফা কামাল ও চাঁদপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ রুহুল্লা জানান, খবরটি জানার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, “দীর্ঘ ১২ বছর প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকেও কীভাবে তিনি বহাল রইলেন তা শুনে খুবই হতাশ হয়েছি। বিষয়টি নিয়ে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের সাথে কথা হয়েছে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জালিয়াতি ও অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”