সংবাদ শিরোনাম ::
পা হারিয়েও হার মানেননি আবু তাহের-জেসমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি
- আপডেট সময় : ০৭:২৮:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

একটি পা নেই। শরীরজুড়ে অসুস্থতার ছাপ। সংসারে নেই জমিজমা, নেই স্থায়ী আয়ের কোনো উৎস। তারপরও ভিক্ষার পথ বেছে নেননি মো. আবু তাহের। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে অটোরিকশা চালিয়ে একসময় সংসার চালিয়েছেন। এখন সেই অটোরিকশাটিও নেই। ফলে স্ত্রী জেসমিন বেগমকে নিয়ে চরম অভাব-অনটনে দিন কাটছে তাঁর।
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ পৌরসভার কেরোয়া গ্রামের বাসিন্দা এই দম্পতির জীবনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি অটোরিকশা। তাঁদের বিশ্বাস, একটি অটোরিকশা পেলে আবারও নিজেদের শ্রমে সংসারের হাল ধরতে পারবেন আবু তাহের। প্রায় ছয় বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন আবু তাহের। জীবন বাঁচাতে তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়। দুর্ঘটনার আগে তিনি ছিলেন কর্মঠ ও সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ। যখন যে কাজ পেয়েছেন, সেটিই করেছেন। সেই আয়ে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালিয়েছেন।

দুর্ঘটনার পর বদলে যায় তাঁর জীবন। শারীরিক সক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি একমাত্র ছেলেকেও হারান তিনি। দুর্ঘটনার পর ছেলে তাঁকে ছেড়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। কিন্তু এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ভেঙে পড়েননি আবু তাহের। জীবিকার তাগিদে একসময় একটি অটোরিকশা চালানো শুরু করেন তিনি। এক পা না থাকলেও বিশেষ কৌশলে অটোরিকশা চালিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলত। নিজের শ্রমে উপার্জনের সেই সুযোগটিও এখন আর নেই। যে অটোরিকশাটি নিয়ে তিনি কাজ করতেন, সেটির মালিক বর্তমানে নিজেই গাড়িটি চালান। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন আবু তাহের।
অন্যদিকে, স্ত্রী জেসমিন বেগমও অসুস্থ। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁদের স্বামীরাও দরিদ্র হওয়ায় মেয়েদের কাছ থেকে নিয়মিত সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে প্রতিবেশীদের দেওয়া খাদ্যসামগ্রী ও সামান্য সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেই দিন পার করছেন তাঁরা। জেসমিন বেগম বলেন, “জমিজমা কিছুই নেই। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি, তাদের স্বামীরাও গরিব। প্রতিবেশীরা যা দেয়, তাই দিয়ে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। আমিও অসুস্থ। তবে আমার স্বামী অটোরিকশা চালাতে পারে। কেউ যদি একটি অটোরিকশা দিয়ে সহযোগিতা করেন, তাহলে আমরা নিজেরাই উপার্জন করে চলতে পারব।”
আবু তাহেরের চাওয়াটিও খুব বেশি নয়। তিনি চান না কারও কাছে নিয়মিত সাহায্যের হাত পেতে বাঁচতে। তাঁর প্রয়োজন শুধু একটি অটোরিকশা—যেটি চালিয়ে তিনি আবারও উপার্জনের সুযোগ পাবেন। আবু তাহেরের ভাষায়, একটি অটোরিকশা পেলে আমি আবার কাজ করতে পারব। নিজের আয় দিয়ে সংসার চালাতে চাই। কারও কাছে হাত পাততে চাই না।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অভাব-অনটনের মধ্যেও আবু তাহের ভিক্ষাবৃত্তিকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেননি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করেও তিনি কাজ করে বাঁচতে চান। তাঁর এই মানসিকতা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার। স্থানীয়দের মতে, একটি অটোরিকশা পেলে শুধু আবু তাহেরের কর্মসংস্থানই হবে না, তাঁর পুরো পরিবারের জীবনে ফিরতে পারে স্বস্তি। প্রতিদিনের খাবার, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের জন্য অন্যের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হবে না তাঁদের।
একটি অটোরিকশা হয়তো সবার কাছে সাধারণ একটি যানবাহন। কিন্তু আবু তাহের ও জেসমিন বেগমের কাছে এটি একটি পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও দারিদ্র্যের কাছে হার না মানা এই দম্পতির পাশে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা মানবিক সংগঠন এগিয়ে এলে তাঁদের জীবনে ফিরতে পারে স্বাবলম্বিতার সুযোগ।।ভিক্ষা নয়, কাজ করে বাঁচতে চান আবু তাহের। প্রয়োজন শুধু একটি সুযোগ। আর সেই সুযোগের চাবিকাঠি হতে পারে একটি অটোরিকশা।










