ফরিদগঞ্জ ১২:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
চাকরি ফেরানোর স্বপ্নে প্রধান শিক্ষকে দেড় লাখ টাকা ঘুষ ফরিদগঞ্জে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ ফরিদগঞ্জে নিয়োগের পর ৬ মাসই অনুপস্থিত, হঠাৎ হাজিরা খাতায় সই ফরিদগঞ্জে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার অঙ্গীকার নিয়ে মা ও শিশু হাসপাতালের উদ্বোধন ফরিদগঞ্জে শেখ হাসিনার জন্মদিন পালন : সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও ৬ ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা গভীর রাতে জানালার গ্রিল কেটে হানা, গলায় দা ঠেকিয়ে লুট ২ ভরি স্বর্ণ কার দাপটে চলে ফরিদগঞ্জ রেজিস্ট্রি অফিস ৬০ হাজার টাকা উত্তোলন, এসএমএস এলো ১ লক্ষ টাকার নতুন নেতৃত্বে ‘স্বপ্নের ফরিদগঞ্জ’ ফরিদগঞ্জে যুবদলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

চাকরি ফেরানোর স্বপ্নে প্রধান শিক্ষকে দেড় লাখ টাকা ঘুষ

নিজস্ব প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৫:৫৭:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
একদিকে চাকরি হারানোর যন্ত্রণা, অন্যদিকে ঋণের বোঝা। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে যেখানে প্রতিদিনই হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় ধার-দেনা করে জোগাড় করেছিলেন দেড় লাখ টাকা। সেই টাকা দেওয়ার পরও চাকরি ফেরেনি। বরং এখন মাথার ওপর চেপে বসেছে ঋণের বোঝা।
এমনই এক অভিযোগ করেছেন ফরিদগঞ্জ উপজেলার মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক দপ্তরী কাম প্রহরী মো. সোহেল রানা। তার অভিযোগ, চাকরিতে পুনর্বহালের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশীদ তার কাছে প্রথমে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। পরে দেড় লাখ টাকা দিতে রাজি হন তিনি। এরপর শত কষ্টে, ঋণ করে সেই টাকা প্রধান শিক্ষকের হাতে তুলে দেন। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও চাকরিতে পুনর্বহালের কোনো ব্যবস্থা হয়নি।
অভিযোগটি অবশ্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশীদ। তার দাবি, সোহেল রানা তাকে কোনো টাকা দেননি এবং চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়ে তার সঙ্গে এমন কোনো কথাও হয়নি। সোহেল রানা জানান, তিনি ২০১৩ সাল থেকে মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম প্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৬ সালের ২৭ জুন চার পিস ইয়াবাসহ ফরিদগঞ্জ থানা পুলিশের হাতে আটক হন তিনি। পরে ১৪ দিন কারাগারে থাকার কথা জানান সোহেল। এরপর চাকরি হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েন তিনি। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় চাকরি ফিরে পাওয়াটাই হয়ে ওঠে তার কাছে বাঁচার প্রধান অবলম্বন। চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে থাকেন তিনি। একপর্যায়ে মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশীদের কাছে ধরনা দেন বলে জানান সোহেল।
সোহেলের অভিযোগ, গত ২৩ আগস্ট প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়ে কথা হলে তাকে জানানো হয়, শিক্ষা অফিসসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ম্যানেজ করতে দুই লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু এত টাকা দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানান সোহেল। পরে টাকার অঙ্ক কমিয়ে দেড় লাখ টাকা দিতে বলা হয় বলে তার দাবি। চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় শেষ পর্যন্ত সেই টাকাই জোগাড় করার চেষ্টা শুরু করেন তিনি। ব্যাংক ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার-দেনা করে দেড় লাখ টাকা সংগ্রহ করেন সোহেল। এরপর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে গিয়ে নগদ টাকা দিয়ে আসেন বলে দাবি তার। তার ভাষ্য, ৫০০ টাকার নোটের একটি বান্ডেল এবং ১ হাজার টাকার নোটের একটি বান্ডেল মোট দেড় লাখ টাকা তিনি প্রধান শিক্ষকের হাতে তুলে দেন।
সোহেলের অভিযোগের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই, চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় যে টাকা দিলেন, সেই টাকা দেওয়ার পরও কেন ফিরল না চাকরি? দিন গড়িয়েছে। মাস গড়িয়েছে। কিন্তু চাকরিতে পুনর্বহালের কোনো খবর পাননি তিনি। একসময় বুঝতে পারেন, চাকরি ফেরার আশায় যে ঋণ করেছিলেন, সেটিই এখন তার পরিবারের জন্য নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোহেল রানা আরো বলেন, চাকরি হারানোর পর বহু কষ্টে দিন কাটছে। হেড স্যার টাকা চাওয়ার পর অনেক কষ্টে লোন তুলে দেড় লাখ টাকা দিয়েছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয়নি। এখন একদিকে চাকরি নেই, অন্যদিকে মাথায় ঋণের বোঝা। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আমি এ ঘটনার সঠিক বিচার চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশীদের সঙ্গে কথা হলে তিনি সোহেলের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন,
সে আমাকে কোনো টাকা দেয়নি। এ বিষয়ে তার সঙ্গে আমার কোনো কথাই হয়নি। এদিকে অভিযোগকারী বলছেন, দেড় লাখ টাকা দিয়েছেন। আর অভিযুক্তের দাবি, তিনি কোনো টাকাই নেননি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে এখন সামনে এসেছে তদন্তের প্রশ্ন।
বিদ্যালয়ের সভাপতি জাকির হোসেন চৌধুরীর কাছেও জানতে চাওয়া হয় বিষয়টি সম্পর্কে। তিনি বলেন,
এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। সোহেল রানা আমাকে এসম্পর্কিত কিছুই জানায়নি।
মৌখিক অভিযোগের বাইরে এবার বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছেন সোহেল রানা। গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ফরিদগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে তিনি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগপত্রে সোহেল উল্লেখ করেন, চাকরিতে পুনর্বহালের জন্য প্রধান শিক্ষক তার কাছে প্রথমে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। পরে দেড় লাখ টাকা দিতে সম্মত হন তিনি এবং ওই টাকা প্রধান শিক্ষক গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ করেন সোহেল। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।
দুই পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যেই এখন অপেক্ষা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে আসলে কী বেরিয়ে আসে। তবে তদন্তের ফল যা-ই হোক, সোহেল রানার সামনে আপাতত বাস্তবতা একটাই, চাকরি নেই, ঋণ আছে। আর স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সংসার চালানোর কঠিন লড়াই চলছে প্রতিদিন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চাকরি ফেরানোর স্বপ্নে প্রধান শিক্ষকে দেড় লাখ টাকা ঘুষ

আপডেট সময় : ০৫:৫৭:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
একদিকে চাকরি হারানোর যন্ত্রণা, অন্যদিকে ঋণের বোঝা। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে যেখানে প্রতিদিনই হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় ধার-দেনা করে জোগাড় করেছিলেন দেড় লাখ টাকা। সেই টাকা দেওয়ার পরও চাকরি ফেরেনি। বরং এখন মাথার ওপর চেপে বসেছে ঋণের বোঝা।
এমনই এক অভিযোগ করেছেন ফরিদগঞ্জ উপজেলার মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক দপ্তরী কাম প্রহরী মো. সোহেল রানা। তার অভিযোগ, চাকরিতে পুনর্বহালের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশীদ তার কাছে প্রথমে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। পরে দেড় লাখ টাকা দিতে রাজি হন তিনি। এরপর শত কষ্টে, ঋণ করে সেই টাকা প্রধান শিক্ষকের হাতে তুলে দেন। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও চাকরিতে পুনর্বহালের কোনো ব্যবস্থা হয়নি।
অভিযোগটি অবশ্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশীদ। তার দাবি, সোহেল রানা তাকে কোনো টাকা দেননি এবং চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়ে তার সঙ্গে এমন কোনো কথাও হয়নি। সোহেল রানা জানান, তিনি ২০১৩ সাল থেকে মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম প্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৬ সালের ২৭ জুন চার পিস ইয়াবাসহ ফরিদগঞ্জ থানা পুলিশের হাতে আটক হন তিনি। পরে ১৪ দিন কারাগারে থাকার কথা জানান সোহেল। এরপর চাকরি হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েন তিনি। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় চাকরি ফিরে পাওয়াটাই হয়ে ওঠে তার কাছে বাঁচার প্রধান অবলম্বন। চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে থাকেন তিনি। একপর্যায়ে মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশীদের কাছে ধরনা দেন বলে জানান সোহেল।
সোহেলের অভিযোগ, গত ২৩ আগস্ট প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়ে কথা হলে তাকে জানানো হয়, শিক্ষা অফিসসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ম্যানেজ করতে দুই লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু এত টাকা দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানান সোহেল। পরে টাকার অঙ্ক কমিয়ে দেড় লাখ টাকা দিতে বলা হয় বলে তার দাবি। চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় শেষ পর্যন্ত সেই টাকাই জোগাড় করার চেষ্টা শুরু করেন তিনি। ব্যাংক ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার-দেনা করে দেড় লাখ টাকা সংগ্রহ করেন সোহেল। এরপর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে গিয়ে নগদ টাকা দিয়ে আসেন বলে দাবি তার। তার ভাষ্য, ৫০০ টাকার নোটের একটি বান্ডেল এবং ১ হাজার টাকার নোটের একটি বান্ডেল মোট দেড় লাখ টাকা তিনি প্রধান শিক্ষকের হাতে তুলে দেন।
সোহেলের অভিযোগের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই, চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় যে টাকা দিলেন, সেই টাকা দেওয়ার পরও কেন ফিরল না চাকরি? দিন গড়িয়েছে। মাস গড়িয়েছে। কিন্তু চাকরিতে পুনর্বহালের কোনো খবর পাননি তিনি। একসময় বুঝতে পারেন, চাকরি ফেরার আশায় যে ঋণ করেছিলেন, সেটিই এখন তার পরিবারের জন্য নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোহেল রানা আরো বলেন, চাকরি হারানোর পর বহু কষ্টে দিন কাটছে। হেড স্যার টাকা চাওয়ার পর অনেক কষ্টে লোন তুলে দেড় লাখ টাকা দিয়েছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয়নি। এখন একদিকে চাকরি নেই, অন্যদিকে মাথায় ঋণের বোঝা। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আমি এ ঘটনার সঠিক বিচার চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশীদের সঙ্গে কথা হলে তিনি সোহেলের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন,
সে আমাকে কোনো টাকা দেয়নি। এ বিষয়ে তার সঙ্গে আমার কোনো কথাই হয়নি। এদিকে অভিযোগকারী বলছেন, দেড় লাখ টাকা দিয়েছেন। আর অভিযুক্তের দাবি, তিনি কোনো টাকাই নেননি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে এখন সামনে এসেছে তদন্তের প্রশ্ন।
বিদ্যালয়ের সভাপতি জাকির হোসেন চৌধুরীর কাছেও জানতে চাওয়া হয় বিষয়টি সম্পর্কে। তিনি বলেন,
এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। সোহেল রানা আমাকে এসম্পর্কিত কিছুই জানায়নি।
মৌখিক অভিযোগের বাইরে এবার বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছেন সোহেল রানা। গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ফরিদগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে তিনি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগপত্রে সোহেল উল্লেখ করেন, চাকরিতে পুনর্বহালের জন্য প্রধান শিক্ষক তার কাছে প্রথমে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। পরে দেড় লাখ টাকা দিতে সম্মত হন তিনি এবং ওই টাকা প্রধান শিক্ষক গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ করেন সোহেল। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।
দুই পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যেই এখন অপেক্ষা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে আসলে কী বেরিয়ে আসে। তবে তদন্তের ফল যা-ই হোক, সোহেল রানার সামনে আপাতত বাস্তবতা একটাই, চাকরি নেই, ঋণ আছে। আর স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সংসার চালানোর কঠিন লড়াই চলছে প্রতিদিন।