গভীর রাতে জানালার গ্রিল কেটে হানা, গলায় দা ঠেকিয়ে লুট ২ ভরি স্বর্ণ
- আপডেট সময় : ১১:১৩:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

নিস্তব্ধ রাত। চারদিকে গভীর ঘুম। হঠাৎ জানালার গ্রিল কাটার শব্দ। মুহূর্তেই ঘরে ঢুকে পড়ে অস্ত্রধারী একদল দুর্বৃত্ত। ঘুম থেকে উঠে কিছু বুঝে ওঠার আগেই গলায় ঠেকানো হয় দা। শুরু হয় মারধর। ছোট সন্তানদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে লুটে নেওয়া হয় স্বর্ণালংকার।
ভয়াবহ এই ডাকাতির ঘটনায় এখনো আতঙ্ক কাটেনি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গুপ্টি পশ্চিম ইউনিয়নের সাইসাঙ্গা গ্রামের সর্দার বাড়িতে। সৌদি প্রবাসী এরশাদ উল্যার বাড়িতে গত ১৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ঘটে এ ঘটনা। পরিবারের ভাষ্য, দেশীয় অস্ত্রসহ ৪ থেকে ৫ জনের একটি ডাকাত দল বসতঘরের জানালার গ্রিল কেটে ঘরে প্রবেশ করে। প্রথমেই তারা প্রবাসীর স্ত্রী নাছিমা বেগম ও তার বড় মেয়েকে মারধর শুরু করে। পরে পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রায় ২ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যায়।
সেই রাতের ভয়াবহতা এখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আমেনা বেগমকে। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সে জানায়, ডাকাতরা তার গলায় দা ঠেকিয়ে দেয়। চিৎকার করার চেষ্টা করলে তাকে মারধর করা হয়। একই সঙ্গে হুমকি দেওয়া হয়, তার ছোট ভাই-বোনদের মেরে ফেলা হবে। একটি কিশোরীর গলায় অস্ত্র ঠেকিয়ে দেওয়া এবং ছোট সন্তানদের হত্যার হুমকির এই ঘটনায় পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
ডাকাতদের কবল থেকে বাঁচতে পরিবারের সদস্যরা সুযোগ পেয়ে চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। পরে স্থানীয় মসজিদের মাইকে ডাকাতির ঘটনা ঘোষণা করা হয়। খবর দেওয়া হয় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ। স্থানীয়দের তৎপরতার পরও কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। ঘটনাস্থলে এসে পুলিশ বাড়ির পাশ থেকে ডাকাতদের ফেলে যাওয়া একটি বড় আকারের ‘সেলাই রেঞ্জ’ উদ্ধার করে নিয়ে যায় বলে জানিয়েছে পরিবার।
ডাকাতদের মারধরে আহত হন পরিবারের সদস্যরা। পরে তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ঘটনার পর থানায় লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়।কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি। প্রবাসীর স্ত্রী নাছিমা বেগম বলেন, তিনি তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে থাকেন। প্রতিদিনের মতো সেদিন রাতেও খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। রাত আড়াইটার দিকে ডাকাতরা জানালার গ্রিল কেটে ঘরে ঢুকে তাকে ও বড় মেয়েকে মারধর করে। পরে ২ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যায়। তিনি বলেন, এর আগেও তাদের বাড়িতে চুরি হয়েছিল। এবার ডাকাতির ঘটনার পর পরিবারের সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
প্রবাসীর ভাই মাওলানা জয়নাল আবেদীন ও বাবা হাজী মোহাম্মদ কাশিমের কথায়ও ফুটে উঠেছে আতঙ্ক ও ক্ষোভ। তাদের ভাষ্য, এর আগে বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। এবার ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও মসজিদে মাইকিং করে স্থানীয়দের সতর্ক করা ছাড়া ডাকাতদের আটক করা সম্ভব হয়নি। থানায় অভিযোগ দিয়েও এখন পর্যন্ত তারা প্রত্যাশিত প্রতিকার পাননি। তাদের আশঙ্কা, এভাবে একের পর এক অপরাধ চলতে থাকলে এলাকার মানুষের জীবনের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাসুম হোসেন জানান, কয়েক মাস আগেও রাতে এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। তখন মসজিদে মাইকিং করা হয়েছিল। এমনকি পরদিন ওই মসজিদের মাইকের মেশিনও চুরি হয়ে যায়। তার ভাষ্য, কয়েকদিন আগে এরশাদ উল্যার বাড়িতে ডাকাতির সময়ও মসজিদে মাইকিং করা হয়েছিল। কিন্তু ডাকাতদের আটক করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, পুলিশ সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ডাকাতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনুক। একই সঙ্গে নির্দোষ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন—এটিও নিশ্চিত করতে হবে। কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, গত কয়েক মাসে গ্রামে একাধিক চুরি, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হলেও কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের।
ডাকাতির ঘটনায় থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উপপুলিশ পরিদর্শক (এসআই) রাকিবুল হাসানকে। তবে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এরশাদ উল্যাহ বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এসআই রাকিবুল হাসানকে অভিযোগটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
একটি ডাকাতির ঘটনা শেষ হয়েছে, কিন্তু সাইসাঙ্গা গ্রামের ওই বাড়িতে শেষ হয়নি আতঙ্ক। জানালার কাটা গ্রিল, রাতের অন্ধকার, গলায় ঠেকানো দা আর ছোট সন্তানদের মেরে ফেলার হুমকি,সব মিলিয়ে সেই রাতের স্মৃতি এখনো পরিবারের সদস্যদের মনে তাজা।
অন্যদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন, একের পর এক চুরি-ডাকাতির অভিযোগের পরও যদি অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, তাহলে রাতের আঁধারে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন কীভাবে তারা? সাইসাঙ্গা গ্রামের মানুষের প্রত্যাশা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক, প্রকৃত অপরাধীরা শনাক্ত হয়ে আইনের আওতায় আসুক এবং আতঙ্কের বদলে এলাকায় ফিরে আসুক নিরাপদ রাতের নিশ্চয়তা।












