স্কাউটিংয়ের পোশাক নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট, অতঃপর ‘জান কবজ’ করার হুমকি!
- আপডেট সময় : ০৩:৫৯:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

স্কাউটিংয়ের আন্তর্জাতিক কর্মসূচি ঘিরে ফেসবুকে সমালোচনামূলক পোস্ট। সেই পোস্টে স্কাউটের পোশাক ও স্কার্ফবিহীন এক কর্মকর্তার ছবি নিয়ে প্রশ্ন। এরপর মুঠোফোনে অকথ্য ভাষায় গালাগাল, একের পর এক প্রাণনাশের হুমকি এবং শহরের লেকের পাড়ে গিয়ে ‘স্কাউটিং শেখার’ চ্যালেঞ্জ! চাঁদপুরে স্কাউটিংয়ের একটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এমনই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে চাঁদপুর সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্কাউটসের সহকারী কমিশনার ও ফরিদগঞ্জ মুক্ত স্কাউট গ্রুপের সম্পাদক মো. জাহিদুল ইসলাম ফাহিম।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠে জেলা স্কাউটস ও রোভারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ৬৯তম জোটা (JOTA) ও ৩০তম জোটি (JOTI) কর্মশালাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট প্রকাশিত হয়। ‘চাঁদপুর স্কাউটস পরিবার’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে ‘Scouting For 24/7’ নামের আইডিতে দেওয়া ওই পোস্টে স্কাউট পোশাক ও স্কার্ফ ছাড়া ……. আক্তারুজ্জামান খোকা এবং সাদা পোশাক পরা কয়েকজন শিক্ষার্থীর ছবি চিহ্নিত করে তাঁদের অংশগ্রহণ ও পোশাকবিধি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পোস্টে চাঁদপুর জেলা রোভারের কার্যক্রম ও নেতৃত্ব নিয়েও তীব্র সমালোচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক স্কাউটিং কর্মসূচিতে সাদা পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, তাঁদের ইউনিট পরিচয় এবং স্কার্ফ না থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি জেলার রোভার কার্যক্রমের অবনতির জন্য নেতৃত্বকে দায়ী করা হয়।
এরপর ওই দিন সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটের দিকে জাহিদুল ইসলাম ফাহিমের ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে শহীদ জাবেদ মুক্ত স্কাউট গ্রুপের সম্পাদক ও
চাঁদপুর পুরান বাজার ডিগ্রি কলেজ শরির চর্চা শিক্ষক মোঃ আখতারুজ্জামান খোকার (01727-007244) এই নাম্বার থেকে কল আসে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ফাহিমের দাবি, ফোনের অপর প্রান্ত থেকে তাঁকে পোস্ট দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তাঁকে চাঁদপুর শহরের লেকের পাড়ে যেতে বলা হয়। এমনকি তাঁর বাড়ির ঠিকানা জানতে চেয়ে ফরিদগঞ্জ থেকে তুলে আনার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এই ঘটনার ফোনালাপের রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্কাউটিং অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্কাউটসের সহকারী কমিশনার মো. জাহিদুল ইসলাম ফাহিমের দাবি, কর্মসূচির দিন ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে তিনি চাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠে কিছুটা দেরিতে পৌঁছান। এ কারণে ছবি তোলার পর্বে অংশ নিতে পারেননি। পরে কর্মসূচিস্থলে গিয়ে অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করেন। তাঁর ফরিদগঞ্জ মুক্ত স্কাউট গ্রুপের সদস্যরাও ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন।
ফাহিম বলেন, কর্মসূচি শেষে বাসায় ফেরার পর রাতে তাঁকে ফোন করা হয়। ফোনদাতা তাঁকে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার জন্য দায়ী করেন। অথচ পোস্টটি সম্পর্কে তাঁর আগে কোনো ধারণাই ছিল না। ফোনদাতার কথা শোনার পর ফেসবুকে ঢুকে তিনি পোস্টটি দেখেন বলে দাবি করেন।
ফাহিমের ভাষ্য, ফোনে তাঁকে বারবার হত্যার হুমকি দেওয়া হয় এবং লেকের পাড়ে যেতে বলা হয়। তাঁর বাড়ির ঠিকানা জানতে চাওয়া ও তাঁকে তুলে আনার হুমকিতে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ কারণে তিনি চাঁদপুর সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে সাধারণ ডায়েরি করেছেন। চাঁদপুর সদর থানার নথিতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ফাহিমের অভিযোগটি সাধারণ ডায়েরিভুক্ত হয়। জিডি নম্বর ১০৩৮ এবং ট্র্যাকিং নম্বর F4PWX3।
জিডিতে জাহিদুল ইসলাম ফাহিম উল্লেখ করেন, একটি মুঠোফোন নম্বর থেকে কল করে তাঁকে অশালীন ভাষায় গালাগাল ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি মানসিকভাবে উদ্বিগ্ন ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে উল্লেখ করেন। ভবিষ্যতে তাঁর ক্ষতি হতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান।
ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছেন ফরিদগঞ্জ মুক্ত স্কাউট গ্রুপের সভাপতি নুরুন্নবী নোমান। তিনি বলেন, “আমরা কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নই। স্কাউটিংকে নিয়ে এমন নোংরা আচরণ একেবারেই অপ্রত্যাশিত ও দুঃখজনক। সিনিয়র নেতারাই যদি অন্য নেতাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন, তাহলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তাঁদের কাছ থেকে কী শিখবে? তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত করার জন্য জেলা স্কাউটস ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি আহ্বান জানান।
এবিষয়ে চাঁদপুর জেলা স্কাউটস কমিশনার মোঃ শাহাজান সিদ্দিক
এএলটি এর কাছে এবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বিষয়টি অবগত হয়েছি, এবিষয়ে ভুক্তভোগী জাহিদুল ইসলাম ফাহিম লিখিত অভিযোগ করলে আমারা জেলা স্কাউটের নির্বাহী কমিটির সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করবো।
স্কাউটিংয়ের মূল শিক্ষা শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতা। সেখানে একটি কর্মসূচির পোশাকবিধি কিংবা সাংগঠনিক অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করাই প্রত্যাশিত। কিন্তু এমন বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ সামনে আসায় স্কাউটিংয়ের পরিবেশ ও নেতৃত্বের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একদিকে আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের পোশাক ও ইউনিট পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জেরে হুমকির অভিযোগ দুটি বিষয়ই যথাযথ তদন্তের দাবি স্কাউট সংশ্লিষ্টদের। এদিকে কর্মশালায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পোশাকবিধি লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, ফেসবুক পোস্টটি কে দিয়েছেন এবং ফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত’ই পারে ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে। স্কাউটিংয়ের মতো শৃঙ্খলাভিত্তিক সংগঠনে অভিযোগের নিষ্পত্তি হোক নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়,এটাই এখন সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।














