যে মাটিতে জন্ম, সেই মাটিতেই শেষ শয্যা
- আপডেট সময় : ০৪:২২:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

যে মাটির আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা, যে জনপদের মানুষের ভালোবাসা বুকে নিয়ে দীর্ঘ পথচলা, জীবনের শেষ অধ্যায়ে সেই জন্মভূমির বুকেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বরেণ্য সাংবাদিক, বিশিষ্ট কলাম লেখক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য মুহম্মদ শফিকুর রহমান। একদিন যে মানুষটি কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন সময়, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা কথা, যিনি সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতির আসনে বসেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে প্রবেশ করেছেন জাতীয় সংসদে, সেই পরিচিত মুখটিকে সোমবার শেষবারের মতো বিদায় জানাল শেকড়ের জনপদ ফরিদগঞ্জ।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার, শোকাতুর মানুষের উপস্থিতি, স্মৃতিচারণ আর দোয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হলো তাঁর পার্থিব জীবনের অধ্যায়। সোমবার (২৬ অক্টোবর) বাদ জোহর চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা পূর্ব ইউনিয়নের বালিথুবা আব্দুল হামিদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জন্মভূমির মাটিতে তাঁর এই শেষ শয্যা যেন একটি দীর্ঘ কর্মময় জীবনের নীরব সমাপ্তি, রেখে গেল অসংখ্য স্মৃতি, অর্জন আর শোকাতুর স্বজন-সহকর্মী-গুণগ্রাহী।
সোমবার জানাজার আগে মরহুমকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। গার্ড অব অনারে নেতৃত্ব দেন ফরিদগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান। এ সময় ফরিদগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আল-আমিন তালুকদারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে বালিথুবা আব্দুল হামিদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর দ্বিতীয় জানাজা। জানাজায় অংশ নেন স্বজন, সহকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও স্থানীয় বাসিন্দারা। জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
একটি জনপদের কাছে তিনি শুধু সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন না; ছিলেন সাংবাদিকতার পরিচিত মুখ, মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণকারী এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রয়াণে ফরিদগঞ্জের সাংবাদিকতা, রাজনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। জানাজার আগে বালিথুবা আব্দুল হামিদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্যে বক্তারা মুহম্মদ শফিকুর রহমানের বর্ণাঢ্য জীবন, সাংবাদিকতায় অবদান, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক পথচলার নানা দিক তুলে ধরেন। তাঁরা তাঁর কর্মময় জীবনের স্মৃতি স্মরণ করেন এবং মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।
স্মৃতিচারণ করেন চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন ভূঁইয়া, বালিথুবা হামিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হুমায়ূন কবির তালুকদার, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. ওমর ফারুক, চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি রহিম বাদশা, চান্দ্রা দরবার শরিফের পীর মাওলানা এস এম হুজ্জাতুল্লাহ, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন সাবু এবং মরহুমের পরিবারের সদস্যরা। জানাজার নামাজে ইমামতি ও দোয়া পরিচালনা করেন চান্দ্রা দরবার শরিফের পীর মাওলানা এস এম হুজ্জাতুল্লাহ। ১৯৪৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা পূর্ব ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের মিয়াজী বাড়ির এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম মুহম্মদ শফিকুর রহমানের। বাবা মৌলভী আবদুল হামিদ, মা আয়েশা খাতুন। গ্রামের পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে শুরু হওয়া তাঁর জীবনযাত্রা সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হয়েছে শিক্ষা, সাংবাদিকতা, মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতির নানা অধ্যায়ে।
ফরিদগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ১৯৬৫ সালে কামিল (হাদিস) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। সেখান থেকে ১৯৭০ সালে স্নাতক এবং ১৯৭১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর ছাত্রজীবন কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনীতি ও প্রগতিশীল সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গেও ছিল তাঁর নিবিড় সম্পৃক্ততা। ১৯৬৫ সালে আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় তাঁর। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয় দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই ১৯৭০ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন মুহম্মদ শফিকুর রহমান। স্বাধীনতার পর পত্রিকাটিতে পূর্ণাঙ্গ সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। এরপর স্টাফ রিপোর্টার, সিনিয়র রিপোর্টার ও বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘ ৩২ বছর দায়িত্ব পালন করেন। সংবাদপত্রের পেশাগত জগতে দীর্ঘ এই পথচলা তাঁকে সাংবাদিকতার অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করে। ২০০২ সালে ইত্তেফাক থেকে অবসর নেওয়ার পরও থেমে যায়নি তাঁর কলম। স্বাধীন কলামিস্ট হিসেবে দৈনিক আজকের কাগজ, দৈনিক ভোরের কাগজ ও দৈনিক জনকণ্ঠের ‘চতুরঙ্গ’ পাতায় নিয়মিত লিখেছেন। সংবাদ প্রতিবেদনের পাশাপাশি কলাম লেখার মধ্য দিয়ে সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন তিনি।
সাংবাদিকতায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ১৯৮৫ সালে জাপানের টোকিও এবং ১৯৯১ সালে জার্মানির বার্লিনে প্রশিক্ষণ ও পড়াশোনা করেন। যুক্তরাজ্যেও উচ্চতর সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ ও পড়াশোনা সম্পন্ন করেন বলে তাঁর জীবনীসংক্রান্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। সাংবাদিক সমাজের নেতৃত্বেও ছিল তাঁর ভূমিকা। ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ মেয়াদে টানা দুবার বাংলাদেশ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। কর্মজীবনে বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল সিটিজেন টিভির চেয়ারম্যান ও প্রধান সম্পাদক এবং সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতেও অংশ নেন মুহম্মদ শফিকুর রহমান। চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসন থেকে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই আসন থেকে নির্বাচিত হন তিনি।২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট পর্যন্ত জাতীয় সংসদে ফরিদগঞ্জের প্রতিনিধিত্ব করেন শফিকুর রহমান। সাংবাদিকতা, মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতির অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর কর্মজীবন ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় পরিসরে। জন্মভূমির মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীতে নিজ বাসভবনে হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন মুহম্মদ শফিকুর রহমান। আশঙ্কাজনক অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা তাঁকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পথচলা। কিন্তু সাংবাদিকতার পেশাগত স্মৃতি, কলাম লেখার অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর ইতিহাস এবং জাতীয় সংসদে দায়িত্ব পালনের অধ্যায় রয়ে গেল তাঁর জীবনের সাক্ষ্য হয়ে।
মৃত্যুকালে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য সহকর্মী, গুণগ্রাহী এবং রাজনীতি ও সাংবাদিকতা অঙ্গনের শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন তিনি। তাঁর চলে যাওয়া পরিবারের জন্য স্বজন হারানোর বেদনা, সহকর্মীদের জন্য দীর্ঘ পথচলার এক পরিচিত মুখের বিদায়, আর ফরিদগঞ্জের মানুষের জন্য নিজ জনপদের এক পরিচিত ব্যক্তিত্বকে হারানোর শোক।
জীবনের শুরু হয়েছিল ফরিদগঞ্জের কৃষ্ণপুরে। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বিচরণ করেছেন সাংবাদিকতা, মুক্তিযুদ্ধ, কলামচর্চা ও জাতীয় রাজনীতির নানা পরিসরে। শেষ পর্যন্ত সেই ফরিদগঞ্জের মাটিতেই হলো তাঁর শেষ ঠিকানা।রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার, দ্বিতীয় জানাজা ও পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের মধ্য দিয়ে বিদায় নিলেন মুহম্মদ শফিকুর রহমান। রেখে গেলেন একটি দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতি, সহকর্মীদের অভিজ্ঞতার ভান্ডার এবং জন্মভূমির মানুষের মনে তাঁর নিজস্ব পরিচয়ের ছাপ।



















