সংবাদ শিরোনাম ::
ফরিদগঞ্জে বিজ্ঞ আদালতে মামলা জটিলতায় বন্ধ বিল্ডিং নির্মাণ কাজ
বিশেষ প্রতিনিধি
- আপডেট সময় : ১০:২৬:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে

ঘরে বাঁশের বেড়া, চালে বাঁশের চাটাই। সেই চাটাইয়ের নিচে শীত, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রচণ্ড খরাতেও পলিথিন মোড়ানো এই ঝুপড়ি ঘরই একমাত্র আশ্রয়স্থল। ঘরের ভেতরে বিছানায় শুয়েই দিনের বেলা সূর্যের আলো আর চাঁদনি রাতে জ্যোৎস্নার দেখা মেলে। কিন্তু সে আলো সুখের অনুভূতি বা সৌখিনতা নয়, বরং নিজেদের সম্পত্তি রক্ষার স্বার্থে দায়েরকৃত মামলা জটিলতায় বাধ্য হয়ে এমন মানবেতর জীবন যাপন করছেন বৃদ্ধ ফয়েজ আহমেদের পরিবারের সদস্যরা। হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের চরমান্দারী গ্রামের বশির উল্লাহ ভূঁইয়া বাড়িতে। দ্রুত সময়ের মধ্যে স্থায়ী আবাসস্থলে উঠতে না পারলে আসন্ন শীতে রোগবালাইয়ের শিকার হওয়ার পাশাপাশি চরম স্বাস্থ্যঝুকিতে রয়েছে ভুক্তভোগীরা।
বিজ্ঞ আদালতে দায়েরকৃত মামলা, থানায় অভিযোগ ও সরেজমিনে জানা যায়, ওই বাড়ির বয়োবৃদ্ধ ফয়েজ আহমেদ যুবক বয়সে শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। অর্ধারে অনারে থেকে কষ্টার্জিত সঞ্চয় দিয়ে দরিদ্রতা গোছানোর স্বপ্ন নিয়ে পরিবারের পুত্র সন্তান মনির হোসেনকে কর্ম শিখিয়ে সৌদি প্রবাসে পাঠান। প্রবাসে ছেলের কামাই করা টাকা দিয়ে একটি বিল্ডিং নির্মাণ কাজ শুরু করেন বাড়িতে। শান্তিপূর্ণভাবে দীর্ঘ ৬ মাসের কর্মযজ্ঞে মাটির নিচ থেকে বিল্ডিংটির ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় একটি চাঁদাবাজ চক্রের কুদৃষ্টি পড়ে ফয়েজ আহমেদের নির্মাণাধীন বিল্ডিংটির উপর। চাঁদাবাজির কৌশল হিসেবে তারা ফয়েজ আহমেদের স্বজন মৃত শাহজাহানের পরিবারকে লেলিয়ে দিয়ে বিরোধ শুরু করে। সৃষ্ট বিরোধের জেরে ইতোমধ্যে প্রতিপক্ষরা ভুক্তভোগী পরিবারের বিল্ডিং নির্মাণ কাজে বাধা ও পরিবারের সদস্যদের মারধরের ঘটনা ঘটিয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরে প্রতিকার না পেয়ে এক পর্যায় ফয়েজ আহমেদের ছোট ভাই মো. তাজুল ইসলাম বাদী হয়ে বিজ্ঞ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। সেই থেকে বিল্ডিংটির নির্মাণ কাজ বন্ধ রেখে ওই ঝুপড়ি ঘরটিতে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের।
ফয়েজ আহমেদ ও তার ছোট ভাই মো. তাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের দৃশ্যমান প্রতিপক্ষ মৃত শাহজাহানের স্ত্রী ও সন্তানরা প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্বজন। তাদের সাথে আমাদের সম্পত্তিগত বিরোধ থাকলেও আমরা যেখানে বিল্ডিংয়ের কাজ শুরু করেছি, সেখানে কোনো বিরোধ নেই। আমরা বিগত ৬ মাস যাবত মাটির নিচ থেকে ছাদ ঢালাই পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে বিল্ডিংটির কাজ করেছি, তখন আমাদের কেউ বাধা দেয়নি। এখন বিল্ডিংটির কাজ শেষ পর্যায়ে, প্রকৃতপক্ষে একটি চাঁদাবাজ চক্রের ইশারায় আমাদের বিল্ডিং নির্মাণ কাজে বাধা প্রদান ও মারধরের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। পরিবারের শিশু সন্তানদের নিয়ে এখন ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছি। সামনে শীত আসছে, এই শীতের আগে বিল্ডিংটির কাজ শেষ না করতে পারলে আমাদের পরিবারের বৃদ্ধ ও শিশুরা নানান রোগবালাইয়ের শিকার হবে। আমরা বিজ্ঞ আদালতের কাছে প্রতিকার চাই।
তারা আরও বলেন, আমরা আদালতে মামলা দায়েরের পর বিজ্ঞ আদালতের নোটিশ প্রদান করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রতিপক্ষের কাছে যায়। এই মামলাটি করার কারণে এটিকে অপরাধ মনে করে প্রতিপক্ষরা আমাদের পরিবারের নারী ও বৃদ্ধ সদস্যদেরকে মারধর করেছে। তাদের পক্ষে প্রভাবশালী চাঁদাবাজ চক্রের সদস্যরা থাকাতে আমরা নিরুপায়। একপ্রশ্নের জবাবে, তারা চাঁদাবাজদের নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
এদিকে বিবাদী পক্ষ মৃত শাহজাহানের ছেলে মো. হারুনুর রশিদ বলেন, ফয়েজ আহমেদ গংদের সাথে আমাদের সম্পত্তিগত বিরোধ রয়েছে। তা সমাধান করতে হবে আগে বলে তিনি দাবী করেন।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শীত আসার আগেই যদি ঝুপড়ি ঘর থেকে এ পরিবারের সদস্যরা স্থায়ী আবাসস্থলে না উঠতে পারেন, তাহলে বয়োবৃদ্ধ ও শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়বে। স্থানীয় একটি চক্র সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে নিজেরা আর্থিক সুবিদা নেয়, তারা মানুষের সমস্যা সমাধান করবে দূরের কথা উল্টো আগে ঘি ঢালার মতো কাজ করে।
ফরিদগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক আবু তাহের বলেন, ফয়েজ আহমেদের পরিবারের সদস্যরা এই সময় এসেও ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছে, বিষয়টি দুঃখজনক। তবে এ ঘটনায় মামলা জটিলতা রয়েছে। বিজ্ঞ আদালতের নোটিশ বিবাদী পক্ষকে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাদী পক্ষের সদস্যরা মারধরের শিকার হয়েছেন মর্মে একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত শেষে সমঝোতা বৈঠকের চেষ্টা করেও বিবাদীদের অসহযোগিতার কারণে সমাধানে ব্যর্থ হয়েছি।
ফরিদগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ বলেন, বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক বিবাদী পক্ষকে নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। পরবর্তীতে বাদী পক্ষের পক্ষে একটি মারধরের অভিযোগ পেয়েছি, তদন্তাধীন আছে। পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এদিকে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, চরমান্দারী গ্রামে ঝুপড়ি ঘরে বসবাসের বিষয়টি আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিজ্ঞ আদালতে মামলা চলমান থাকায় তাদের আবাসস্থলের বিষয়ে আমাদের কিছুই করার নেই। তবে আর কিছুদিনপর আসছে শীতকাল, এভাবে ঝুপড়ি ঘরে বসবাসের কারণে পরিবারটির বয়োবৃদ্ধ ও শিশুরা নানান রোগবালাইয়ের শিকার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।














