নিজের ঘর নেই, সড়কের পাশে বর্জ্য।। এ কেমন প্রথম শ্রেণির পৌরসভা!
- আপডেট সময় : ০৫:১৭:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

প্রতিদিন পৌরবাসীর নতুন ভবনের জন্য নকশা প্রনয়ন অনুমোদনসহ নানা কাজ করলেও ২০০৫ সালে স্থাপিত ফরিদগঞ্জ পৌরসভার আজ পর্যন্ত নিজস্ব কোন ভবন নেই। প্রতিষ্ঠার পর ২১ বছর অতিবাহিত হলেও পৌরকর্তৃপক্ষ নিজস্ব জায়গা ম্যানেজ করতে না পারায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় জোড়াতালি দিয়ে ‘ক’ শ্রেণীর এই পৌরসভাটির কার্যক্রম চলছে।
পৌর কর্তৃপক্ষ ৫০ শতক জমি বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রনালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে মতামত চেয়ে চিঠি পাঠায় । কিন্তু লাল ফিতার চাপায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। সম্প্রতি পৌরসভার জন্য নিজস্ব ভূমির ব্যবস্থা না করতে পারলে সরকারের খাস সম্পত্তি বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়টি আবারো নিজস্ব ভবনের স্বপন দেখছে পৌরবাসী।
জানা গেছে, চাঁদপুর জেলার অন্যতম জনবহুল উপজেলা সদর তথা গুরুত্বপূর্ণ ফরিদগঞ্জ পৌরসভা ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করে ধাপে ধাপে এখন প্রথম শ্রেণিতে (এ-গ্রেড) উন্নীত হয়। বর্তমানে ১৯.৭৫ বর্গ মাইলের আয়তনের পৌরসভাটিতে ২০২২ সনের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী ৪০ হাজার ৭শত ৮৮ জন লোক বসবাস করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাস্তাঘাট সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং রাতে চলাচলের জন্য স্ট্রিট লাইট স্থাপনসহ নানা অবকাঠামোগত উন্নয়ন চলমান। তবে এই দৃশ্যমান ঝকঝকে উন্নয়নের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে পৌরসভার দুটি মৌলিক ও দীর্ঘস্থায়ী সংকট। স্থায়ী প্রশাসনিক ভবন এবং ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভার নাগরিক সেবা ও পরিবেশ খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পৌর এলাকায় সংগৃহীত বর্জ্য ফেলার জন্য কোনো স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় নিরুপায় হয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রতিদিনের আবর্জনা শহরের প্রবেশমুখের মহাসড়ক ও বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কের পাশেসহ বিভিন্ন স্থানে ফেলছে। ফলে এর থেকে সৃষ্ট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, যা পথচারী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৈরি হচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, ছড়াচ্ছে মশা-মাছির উপদ্রব ও নানা সংক্রামক ব্যাধি। যদিও পৌর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বর্জ্য সংকটের স্থায়ী নিরসনে একটি আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের জন্য বর্তমানে ভূমি ক্রয়ের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে কিন্তু সমস্যা জমি সংকট।
অন্যদিকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভার সুযোগ-সুবিধাসম্বলিত প্রশাসনিক ভবন থাকা বাধ্যতামূলক হলেও ফরিদগঞ্জ পৌরসভার ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। প্রতিষ্ঠার পর গত ২১ বছরেও পৌরসভার নিজস্ব কোনো স্থায়ী ভবন নির্মিত হয়নি। বর্তমানে চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একটি পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ জিউসি টাইপের অফিসে কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে এর দাপ্তরিক কার্যক্রম।
ফলে স্যাতস্যাঁতে পরিবেশ অপরিসর ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাদাগাদি করে কাজ করতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়। ফলে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন জরুরি সেবা নিতে আসা শত শত সাধারণ মানুষ।
ফরিদগঞ্জ পৌর নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক মোশারেফ হোসেন ও সদস্য সচিব ইমাম হোসেন বলেন, প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত পৌরসভার নিজস্ব ভবনের পাশাপাশি স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোন ব্যবস্থা না থাকা দুঃখজনক। এমন আদিম ও বেহাল দশা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
পৌরসভা কার্যালয়ের নথি ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমির উপর থাকা বর্তমান অস্থায়ী কার্যালয়টি পৌরসভার অনুকূলে স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বিগত ২০১২ এবং ২০১৬ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দফায় দফায় চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠির আলোকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মতামত চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বছরের পর বছর ধরে ফাইলটি টেবিলেই বন্দি হয়ে থাকে। সর্বশেষ চলতি বছরে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে জেলা প্রশাসক কর্তৃক পানি উন্নয়ন বোর্ড, চাঁদপুরকে এ বিষয়ে দ্রুত মতামত ও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আরেকটি তাগিদপত্র পাঠানো হয়। এত কিছুর পরও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর সুরাহা বা দৃশ্যমান অগ্রগতি মেলেনি।
জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশা—উচ্চপর্যায়ের আমলাতান্ত্রিক দেয়াল ভেঙে সরকার যেন অতি দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গাটি পৌরসভার নামে স্থায়ী বরাদ্দ দেয় এবং পরিবেশ রক্ষায় ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনে দ্রুত ও জরুরি ভূমি অধিগ্রহণের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তা না হলে এই অঞ্চলের কাঙ্ক্ষিত নগর উন্নয়ন অধরাই থেকে যাবে।
পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ সুফিয়ান খাঁন বলেন, একাধিকবার মন্ত্রণালয় পানি উন্নয়ন বোর্ডে চিঠি দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এখনও চেষ্টা অব্যাহত আছে। তাছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য জায়গাও খেঁজা হচ্ছে।
পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়া জানান, ফরিদগঞ্জ পৌরসভার জন্য নিজস্ব ভবন ও বর্জ্য ব্যবস্থপনার জায়গা আমরা খুঁজছি। পৌরসভার নিজস্ব ভবনের জন্য আমরা বিকল্প চিন্তা থেকে সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় জায়গার বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে একটি স্থায়ী ভবন হলে পৌরবাসীর জন্য ভালো হবে।










