ফরিদগঞ্জে মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে ২৫ বছরের দ্বৈত চাকরির অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৮:৩৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

একটি সরকারি সুবিধাপ্রাপ্ত মাদ্রাসার প্রধান। একই সঙ্গে ডাক বিভাগের একটি পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্টার। দুটি প্রতিষ্ঠানের দুটি দায়িত্ব, দুটি কর্মস্থল, আর অভিযোগ অনুযায়ী, দুটি উৎস থেকেই নিয়মিত বেতন গ্রহণ। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে এমন এক বাস্তবতার অভিযোগ ঘিরে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন পূর্ব এখলাছপুর দারুল এখলাছ আমেনা (রা.) মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই বিষয়টি অনেকের জানা থাকলেও নানা কারণে তা আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় আসেনি। সম্প্রতি সরকারি বেতন ব্যবস্থাপনায় iBAS++ চালুর প্রক্রিয়ায় তথ্য যাচাইয়ের সময় বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। এরপরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—একজন ব্যক্তি কীভাবে বছরের পর বছর দুটি সরকারি সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে একযোগে দায়িত্ব পালন করেছেন? সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নজর এড়িয়ে বিষয়টি এত দিন চলল কীভাবে?
অভিযোগ অনুযায়ী, মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদ একদিকে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, অন্যদিকে একলাছপুর পোস্ট অফিসে পোস্ট মাস্টার (ইডিএ) হিসেবেও কর্মরত থেকে উভয় প্রতিষ্ঠান থেকেই নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৬–এর ১১ ধারার ১০ উপধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী অন্য কোনো লাভজনক পদে নিয়োজিত থাকলে তার এমপিও সুবিধা বাতিলযোগ্য।

দ্বৈত চাকরির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদ বলেন, “২০১৫ সাল থেকেই জানি, দ্বৈত চাকরি করা যায় না।” তবে এত দিন কেন দুটি চাকরি চালিয়ে গেছেন, এ প্রশ্নের উত্তরে কিছুটা নীরব থেকে তিনি বলেন, “এর কোনো উত্তর আমার কাছে নেই।”
তিনি দাবি করেন, কয়েক মাস আগে পোস্ট মাস্টারের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু জুন মাসের বেতন উত্তোলনের তথ্য সামনে আনা হলে তিনি বলেন, “কাজ করেছি, তাই বেতন নিয়েছি। পরে সেই টাকা ফেরত জমা দিয়েছি।”
তবে ডাক বিভাগের তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। ফরিদগঞ্জ উপজেলা পোস্ট মাস্টার আনিছুর রহমান জানান, ইকরাম হোসেন হামিদ জুন মাসের বেতন উত্তোলন করেছেন। তার দপ্তরে কোনো পদত্যাগপত্র জমা পড়েনি। চলতি জুলাই মাসের বেতনের রোলও এসেছে, তবে জেলা পোস্ট পরিদর্শকের মৌখিক নির্দেশে সেটি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ইউনিয়ন পোস্ট মাস্টারদের বেতন বর্তমানে ধাপে ধাপে iBAS++ ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য ইকরাম হোসেন হামিদ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দিয়েছেন। তখনই তাকে জানানো হয়, একই ব্যক্তি দুটি পৃথক iBAS আইডির মাধ্যমে সরকারি বেতন গ্রহণ করতে পারবেন না।
চাঁদপুর জেলা পোস্ট পরিদর্শক ফারুক খান বলেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। আগামী মাস থেকে ইকরাম হোসেন হামিদের নামে পোস্ট মাস্টারের বেতনের রোল আর পাঠানো হবে না।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, “অভিযোগটি তদন্ত করে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
উল্লেখ্য, গত বছর দাখিল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদ সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন। নতুন করে দ্বৈত চাকরির অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু একজন ব্যক্তির দায় নয়; দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনিক তদারকির দুর্বলতাও সামনে আসবে। তাদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহারের এমন অভিযোগ আর না ওঠে।












